আমার মা-ই সব করে দিত!

আমার মা-ই সব করে দিত!

বিয়ের পরে অনেক নতুন বিষয়ের সাথে পরিচিত হতে হয়। তার মধ্যে একটি  হলো পারিবারিক মূল্যবোধ। যা নিয়ে পারস্পরিক কথা বলা সহজ মনে হলেও আসলে অতটা সহজ নয়! একটি ছেলে বা মেয়ে যখন কোনো ভালবাসার সম্পর্কে জড়ায় তখন তার ভালবাসার ধরণ কেমন হবে তা অনেকখানি নির্ভর করে ছেলে বা মেয়েটির পারিবারিক জীবনের ওপর। কিভাবে তারা তাদের নিজ নিজ পরিবারে প্রতিপালিত হয়েছে তা পরবর্তীতে তাদের দাম্পত্য জীবনেও ভীষণভাবে প্রভাব ফেলে। ধরুন ঐ ছেলে বা মেয়েটির পরিবার যদি তাকে সব কাজ করে দিয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তীতে সে নিজের অজান্তেই চাইবে তার জীবন সঙ্গীও তাকে সব কিছু করে দিক।

আমাদের পরিবারগুলোতে প্রায় দেখা যায় মায়েরা তাদের ছেলেদের কাপড়চোপড় ধোয়া, আয়রন করা, গুছিয়ে দেয়াসহ প্রায় সব কাজ করে দেয়। ফলে ঐ ছেলেটি জীবনধারণের এসব গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা এক প্রকার না শিখেই বেড়ে ওঠে। সে যেহেতু সারা জীবন এই জিনিসগুলো রেডি পেয়ে এসেছে তাই বিয়ের পরেও চায় ওগুলো রেডিই থাক। তবে বাঁধ সাধে তখন, যখন তার নতুন বউ এই কৃষ্টির সাথে পরিচিত নয়। এ অবস্থায় নতুন দাম্পত্য জীবনে মন কষাকষির সৃষ্টি হতে পারে। দুজনেরই মনে হতে পারে কেউ কাউকে বুঝতে পারছে না। যখন দুজন দুজনের কাছে আসার সময় তখন সংসারের কাজ, গুছিয়ে রাখার কাজ নিয়ে গোল বাঁধে। এই সমস্যা বোঝাতে যাওয়া আবার আরো দুষ্কর হয়ে যায় কারণ বোঝাতে গেলে আমাদের পিতৃতান্ত্রিক পরিবারিক মূল্যবোধে আঘাত লাগে। এভাবে আমরা একে অপরকে হারাচ্ছি। মিস করছি একজন আরেকজনের অনুভুতি, ভালবাসা এবং যত্ন।

এখন প্রশ্ন হতে পারে- একজনের কাজ আরেকজন করে দেয়াই তো যত্ন করা। সেটা নিয়ে তো কথা হচ্ছিল। হ্যা, সেটা নিয়েই কথা হচ্ছিলো। তবে যত্ন নেয়ার বিষয়টি দুই পাক্ষিক হতে হবে। একজন যত্ন করে যাবে আর আরেকজন শুধু যত্ন পেয়েই যাবে তা নয়। কাজ করে দিলেই যে যত্ন করা হয়ে গেল তাও কিন্তু সঠিক নয়। কে তাকে কতটা কাজ করে দিল মানুষ সেটা মনে রাখে না বরং সেটা মনে রাখে কে তাকে কেমন অনুভব করালো। তাই সামান্য কাছে বসে থাকাও একটি ভাল অনুভুতি দিতে পারে।

আমাদের মেয়েদের দিকে তাকালে আবার উল্টো চিত্র দেখতে পাই। মেয়েদের ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্ত নেবার এখতিয়ার আরেকজনের হাতে দিয়ে দেয়া হয়। সব সিদ্ধান্ত যেন বাবা, বড় ভাই-ই নিয়ে দিবে। তাই দীর্ঘশ্বাস পরলেও সত্যি যে এই মেয়েটির নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়ার সক্ষমতা তৈরি হয় না। ফলে জীবনের পরতে পরতে সিদ্ধান্ত নেবার সময় সে জটিলতার সম্মুখীন হয়। দিশেহারা হয়ে মানুষ খুঁজতে থাকে, কে তাকে এখন এই বিপদ থেকে উদ্ধার করবে, তার সিদ্ধান্তটি নিয়ে দিবে। এ অবস্থাতে মেয়েটি তার প্রয়োজনের কথাও বলতে শিখে না। তাই অন্যরা তার জন্য যেটা বেছে দেয় সে সেটাই গ্রহণ করে। যেহেতু অন্যরা তার সিদ্ধান্ত নিয়ে দিচ্ছে, ঐ সিদ্ধান্ত নিয়ে সে অধিকাংশক্ষেত্রেই সুখি হতে পারে না ।

সন্তান লালনপালন আমাদের প্রত্যেকের জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কও একটি শিশুর জন্য অনুকরণীয় বিষয়। একজন স্বামী তার স্ত্রীর সঙ্গে যে আচরণ করেন, তার কন্যা সন্তানটিও এই আচরণটিকেই আদর্শ বলে ধরে নিয়ে তার মায়ের মতো জীবন প্রত্যাশা করবে। কারণ ছোট্ট কন্যা সন্তানটির কাছে বাবাই হলেন আদর্শ। মানুষ চেষ্টা করলে সব পারে। তাই জেন্ডারকে উপলক্ষ না করে আমরা আমাদের ছেলে মেয়েদের যদি শিক্ষা প্রদান করি তাহলে পরবর্তীতে জীবনটা গুছিয়ে নিতে দুজনের জন্যই সহজ হয়।

মরিয়ম সুলতানা সুরভি
+ posts

সিনিয়র সাইকো সোশ্যাল কাউন্সিলর। ব্রাক ইন্সটিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট (BIED)

Post Author: মরিয়ম সুলতানা সুরভি

সিনিয়র সাইকো সোশ্যাল কাউন্সিলর। ব্রাক ইন্সটিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট (BIED)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।